আপনার পাকস্থলীতে অভ্যন্তরীণ জটিলতা রয়েছে কিনা জানবেন কিভাবে?

আপনার পাকস্থলীতে অভ্যন্তরীণ জটিলতা রয়েছে কিনা জানবেন কিভাবে?

পাকস্থলীর অভ্যন্তরীণ জটিলতা বোঝার জন্য, ক্রমাগত পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ঢেকুর, হজমের সমস্যা, বা দ্রুত ওজন কমার মতো লক্ষণগুলির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। জটিলতা নিশ্চিত করার জন্য, একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শে রক্ত ​​পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, বা আপার জিআই এন্ডোস্কোপি করে সঠিক রোগ নির্ণয় করা যেতে পারে। 

পাকস্থলীতে কোনো সমস্যা বা জটিলতা থাকলে, সাধারণত নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা যায়: পেটের উপরের অংশে, নাভির চারপাশে, বা বুকের নিচে জ্বালাপোড়া বা ক্রমাগত ব্যথা। খাওয়ার পর বা খালি পেটে ব্যথা আরও বাড়তে পারে। বুকজ্বালা, ঢেকুর, পেট ফাঁপা, বা গ্যাস। হঠাৎ ক্ষুধামান্দ্য, অল্প খাবার খেয়েই পেট ভরে যাওয়া, এবং ঘন ঘন বমি বমি ভাব।  কোনো আপাত কারণ ছাড়াই দ্রুত এবং অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস।  কালো বা আলকাতরার মতো মল, অথবা মলের সাথে রক্ত। একইভাবে, বমিতে রক্ত ​​বা কফির গুঁড়ো।


পাকস্থলীর অভ্যন্তরীণ জটিলতার সাধারণ লক্ষণসমূহ: 

১. ঘন ঘন গ্যাস্ট্রাইটিস, বুকজ্বালা, মুখে টক স্বাদ এবং টক ঢেকুর (লক্ষণ ১, ৬, ৯) কার্যপ্রণালী: আমাদের পাকস্থলী খাবার হজম করার জন্য খুব শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করে। পাকস্থলী এবং খাদ্যনালীর মধ্যে একটি বিশেষ পেশীযুক্ত কপাটিকা থাকে। কোনো কারণে এই কপাটিকা দুর্বল হয়ে গেলে, পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসে।

ফলাফল: অ্যাসিডের কারণে খাদ্যনালীতে তীব্র জ্বালাপোড়া হয়, যাকে আমরা বুকজ্বালা বলি। এই অ্যাসিড যখন মুখে পৌঁছায়, তখন মুখে টক বা তেতো স্বাদ হয় এবং টক ঢেকুর ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে জিইআরডি (GERD) বলা হয়।


২. পেটে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া (লক্ষণ ২) কার্যপ্রণালী: পাকস্থলীর ভেতরের দেওয়ালে একটি প্রতিরক্ষামূলক শ্লেষ্মা স্তর থাকে, যা পাকস্থলীকে তার নিজের অ্যাসিড থেকে রক্ষা করে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ (এইচ. পাইলোরি) বা অতিরিক্ত ব্যথানাশক ব্যবহারের কারণে এই আস্তরণটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলাফল: যখন পাকস্থলীর আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন অ্যাসিড সরাসরি পাকস্থলীর প্রাচীরে আঘাত করে, যার ফলে প্রদাহ (গ্যাস্ট্রাইটিস) বা ঘা (পেপটিক আলসার) হয়। এর কারণে পাকস্থলীর উপরের অংশে (এপিগ্যাস্ট্রিক অঞ্চলে) তীব্র বা জ্বালাপোড়া ব্যথা হয়।


৩. খাওয়ার পর অস্বস্তি, পেট ভরা লাগা, দ্রুত পেট ভরে যাওয়া এবং ফোলাভাব (লক্ষণ ৩, ৫, ৮) কার্যপ্রণালী: একটি সুস্থ পাকস্থলী খাবার গ্রহণের পর সংকুচিত ও প্রসারিত হয়, যা খাবারকে পরিপাকনালীর মধ্য দিয়ে সহজে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন পাকস্থলী অসুস্থ বা প্রদাহযুক্ত থাকে, তখন এর স্বাভাবিক নড়াচড়া বা হজমের গতি (গ্যাস্ট্রিক মটিলিটি) কমে যায়। ফলাফল: খাবার দীর্ঘ সময় ধরে পাকস্থলীতে থেকে যায়। ফলে, অল্প পরিমাণ খাবার খাওয়ার পরেই পেট ভরে যায় (আর্লি স্যাটিয়েশন)। খাবারের সঠিক হজম না হওয়ার কারণে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত গ্যাস জমা হয়, যার ফলে পেট ফুলে যায় বা স্ফীত হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফাংশনাল ডিসপেপসিয়া বা বদহজম বলা হয়।


৪. বমি বমি ভাব বা বমি (লক্ষণ ৪) কারণ: পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণে গুরুতর সংক্রমণ বা আঘাত থাকলে, পাকস্থলী খাবার শোষণ করতে পারে না। তখন আমাদের মস্তিষ্ক পাকস্থলী খালি করার জন্য সংকেত পাঠায়। ফলাফল: এর ফলে খাওয়ার পর বা এমনকি খালি পেটেও তীব্র বমি বমি ভাব হতে পারে, অথবা সরাসরি বমি হতে পারে।


৫. ক্ষুধামান্দ্য, দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা এবং ওজন হ্রাস (লক্ষণ ৭, ১০) কারণ: এটি একটি শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া বা ক্রমাগত সমস্যা। পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং অস্বস্তির কারণে রোগীর ধীরে ধীরে খাওয়ার আগ্রহ কমে যায় (ক্ষুধামান্দ্য)। ফলাফল: পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়ার কারণে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি, ভিটামিন এবং ক্যালোরি পায় না। ফলে শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শরীরের ওজন দ্রুত কমে যায়।


কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যান। (বিপজ্জনক লক্ষণ) যদি আপনার এই উপসর্গগুলোর সাথে নিম্নলিখিত ৩টি "বিপজ্জনক লক্ষণ" বা বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে আপনার বোঝা উচিত যে আপনার পাকস্থলীতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা কোনো বড় ধরনের জটিলতা রয়েছে:

কালো মল: যদি মল আলকাতরার মতো কালো এবং দুর্গন্ধযুক্ত হয়।

হেমাটুরিয়া (প্রস্রাবের সাথে রক্ত): বমির সাথে তাজা রক্ত ​​অথবা কফির গুঁড়োর মতো কালো বমি হওয়া।

অ্যানিমিয়া (রক্তাল্পতা): রক্তক্ষরণের কারণে ফ্যাকাশে ভাব, সামান্য হাঁটাচলার ফলেও বুক ধড়ফড় করা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি।


কী করবেন এবং রোগ নির্ণয়: যদি এই উপসর্গগুলো ২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে, তাহলে আপনার ফার্মেসি থেকে নিজে থেকেই পাকস্থলীর ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ, ওষুধ সেবন সাময়িকভাবে উপসর্গগুলোকে চাপা দেয়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ রোগ (যেমন আলসার বা টিউমার) আরও জটিল হয়ে ওঠে। একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শে এন্ডোস্কোপি পরীক্ষার মাধ্যমে পাকস্থলীর প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব।